• শুক্রবার ১২ জুন ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  • /
  • ব্যাংক-বীমা
  • /
  • বিমা দাবি নিষ্পত্তিতে চরম দুরবস্থা, আস্থাহীনতায় বিপাকে গ্রাহকরা

বিমা দাবি নিষ্পত্তিতে চরম দুরবস্থা, আস্থাহীনতায় বিপাকে গ্রাহকরা

দেশের সাধারণ বিমা খাতে (নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স) দাবি নিষ্পত্তিতে ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। গ্রাহকদের হাজার হাজার কোটি টাকার দাবি বছরের পর বছর ঝুলে থাকায় বিমা খাতে আস্থার সংকট আরও গভীর হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থিক দুর্বলতা, পুনঃবিমার অর্থ আটকে থাকা এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের গড়িমসির কারণে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে।


বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৪৬টি সাধারণ বিমা কোম্পানিতে মোট ৪ হাজার ৬৭৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকার দাবি উত্থাপিত হয়েছে। এর বিপরীতে পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ১৬৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা মোট দাবির মাত্র ২৫ শতাংশ। বাকি ৩ হাজার ৫০৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বা ৭৫ শতাংশ দাবি এখনো বকেয়া রয়েছে।


খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এত বিপুল পরিমাণ দাবি অনিষ্পন্ন থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে বিমা খাত নিয়ে আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বিমা ব্যবসা আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।


পুনঃবিমার অর্থ আটকে থাকাকে দায় দিচ্ছে কোম্পানিগুলো


বেসরকারি বিমা কোম্পানিগুলোর অভিযোগ, রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বিমা করপোরেশন থেকে পুনঃবিমার অর্থ সময়মতো না পাওয়ায় তারা গ্রাহকদের দাবি নিষ্পত্তি করতে পারছে না। অনেক প্রতিষ্ঠানের মতে, পুনঃবিমা বাবদ বিপুল অর্থ আটকে থাকায় তাদের তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে।


তবে সাধারণ বিমা করপোরেশন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, যথাযথ নথিপত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হলে কোনো দাবির অর্থ আটকে রাখা হচ্ছে না এবং তাদের আর্থিক সক্ষমতারও কোনো ঘাটতি নেই।


সবচেয়ে বেশি বকেয়া সাধারণ বিমা করপোরেশনে


পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দাবি বকেয়া রয়েছে সাধারণ বিমা করপোরেশনে। প্রতিষ্ঠানটিতে ২ হাজার ৪৮৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকার দাবির বিপরীতে পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র ২৯৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ, নিষ্পত্তির হার মাত্র ১২ দশমিক ০৬ শতাংশ। ফলে এখনো বকেয়া রয়েছে ২ হাজার ১৮৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।


বেসরকারি খাতের বড় কোম্পানিগুলোর মধ্যেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সে ৪১১ কোটি ২ লাখ টাকার দাবির মধ্যে পরিশোধ হয়েছে ৮১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, আর বকেয়া রয়েছে ৩২৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।


একইভাবে রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স ২০০ কোটি ৬৫ লাখ টাকার দাবির মধ্যে ১৪০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং প্রগতি ইন্স্যুরেন্স ১৯৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার দাবির বিপরীতে ১৩০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা এখনো পরিশোধ করতে পারেনি।


চার প্রতিষ্ঠানের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক


কিছু বিমা কোম্পানির পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ৯০ শতাংশের বেশি দাবি এখনো অনিষ্পন্ন রয়েছে।


পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স ২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকার দাবির বিপরীতে মাত্র ১ কোটি ১২ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির ৯৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ দাবি বকেয়া রয়েছে।


পিপলস ইন্স্যুরেন্সে ৯৪ কোটি ১৫ লাখ টাকার দাবির মধ্যে পরিশোধ হয়েছে মাত্র ৬ কোটি ৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ, ৯৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ দাবি এখনো অনিষ্পন্ন।


নর্দান ইসলামী ইন্স্যুরেন্স এবং বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ ইন্স্যুরেন্সের অবস্থাও প্রায় একই রকম। এসব প্রতিষ্ঠানের দাবি নিষ্পত্তির হার অত্যন্ত কম হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।


এ ছাড়া রিপাবলিক, স্ট্যান্ডার্ড, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ, দেশ জেনারেল, অগ্রণী, গ্লোবাল ও মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের দাবি নিষ্পত্তির হারও ২৫ শতাংশের নিচে রয়েছে।


কিছু কোম্পানির পারফরম্যান্স ইতিবাচক


সব কোম্পানির চিত্র অবশ্য এক রকম নয়। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে।


ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স ১৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকার দাবির মধ্যে ১৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা পরিশোধ করে ৯৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ নিষ্পত্তি করেছে।


জনতা ইন্স্যুরেন্স, ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স এবং সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সও ৯০ শতাংশের বেশি দাবি নিষ্পত্তি করেছে।


এ ছাড়া ইউনিয়ন, ফেডারেল, প্রাইম ইসলামী, বাংলাদেশ জেনারেল ও ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্স ৮০ শতাংশের বেশি দাবি নিষ্পত্তি করে তুলনামূলক ভালো অবস্থান ধরে রেখেছে।


মাঝারি অবস্থানের কোম্পানিগুলোকেও ঝুঁকিতে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা


ঢাকা ইন্স্যুরেন্স, সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্স, তাকাফুল ইসলামী, এক্সপ্রেস, মার্কেন্টাইল ইসলামী, সেনা কল্যাণ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল, প্রভাতী, প্যারামাউন্ট, ফিনিক্স ও ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের দাবি পরিশোধের হার ৫০ শতাংশের নিচে রয়েছে।


খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এ হারও সন্তোষজনক নয়। দীর্ঘমেয়াদে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা ও গ্রাহক আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।


## আস্থাহীনতায় বিদেশমুখী হচ্ছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান


একটি সাধারণ বিমা কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দাবি নিষ্পত্তির হার ২৫ শতাংশে নেমে আসা পুরো বিমা খাতের জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত।


তার ভাষায়, “স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দাবি নিষ্পত্তির হার ৮০ শতাংশের বেশি থাকা উচিত। কিন্তু আর্থিক দুর্বলতা ও পুনঃবিমার অর্থ আটকে থাকায় অনেক কোম্পানি গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করতে পারছে না।”


তিনি আরও বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানের দাবি নিষ্পত্তির হার ১০ শতাংশের নিচে, তাদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে। এ অবস্থায় অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান স্থানীয় বিমা কোম্পানির পরিবর্তে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করছে।


বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাইফুদ্দীন বলেন, সার্বিকভাবে ৭৫ শতাংশ দাবি বকেয়া থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সাধারণ বিমা কোম্পানির বড় অংশের ব্যবসা পুনঃবিমা করা হয় এবং এর একটি বড় অংশ বাধ্যতামূলকভাবে সাধারণ বিমা করপোরেশনে রাখতে হয়। কিন্তু সেখান থেকে অর্থ সময়মতো না পাওয়ায় পুরো খাতেই চাপ তৈরি হয়েছে।


অন্যদিকে সাধারণ বিমা করপোরেশনের উপমহাব্যবস্থাপক মো. আবদুল মতিন দাবি করেন, পুনঃবিমার অর্থ পরিশোধে তাদের কোনো সমস্যা নেই। প্রয়োজনীয় নথিপত্র সঠিকভাবে জমা না দেওয়ার কারণেই কিছু দাবির অর্থ আটকে আছে।